সোহাগ হঠাৎ করে কাউকে কিছু না বলে গিনি কে বউ সাজিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলো। মাকে ডেকে বললো সুযোগ পাইনি তাই বলতে পারিনি। মা তো অবাক, এ কী কান্ড! কার মেয়ে, কোন বংশের মেয়ে, কোন জাতের মেয়ে কিছুই জানা নাই, তাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। সোহাগের ছোটোবোন সোহানা এগিয়ে আসে। সেও শুনে মুখে হাত দেয়। গিনিকে জিগ্যেস করে তার পরিচয়। জবাব দেয় সোহাগ। একসময় ঘরে তোলে নতুন বউকে।
গিনি গরীব ঘরের মেয়ে হওয়ায় কটু কথা শোনায় সোহাগের মা। তবুও সোহাগের কারনে বেশিকিছু বলতে পারে না। দু’তিন দিন কেটে যায়। গিনি শিক্ষিত, মার্জিত ও ভদ্র হওয়ায় ধীরে ধীরে সকলের মন জয় করে নেয়। সে আসলে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে সোহাগের সাথে বিয়ে করেছে। তার বাড়ির লোকজন সে সংবাদ পেয়ে তাদের বাড়িতে মেয়ের বড়ভাই ও মামা আসে সোহাগদের বাড়ি। এসে আশেপাশের লোকজনকে সোহাগদের কথা জানতে চাইলে সকলেই ভালো বলে। সোহাগের বাবা বেশ ভালো মানুষ ছিলেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। গিনির বাপের বাড়ির লোকজন সোহাগদের পরিবাবরের লোকজনদের শুরুতে আড়চোখে দেখলেও পরে তারা সবকিছুতে মিলেমিশে যায়। পরদিন তারা সোহাগ ও গিনিকে নিয়ে তাদের বাড়িতে বেড়াতে যায়। সাথে যায় সোহাগের এক বাল্যবন্ধু সজিব।
সেখানে তিনদিন থেকে আবার গিনিকে নিয়ে সোহাগ ফিরে আসে বাড়ি। সবকিছু ভালোই চলতে থাকে। মা একদিন বলে এবার কাজকর্ম কিছু একটা করতে হবে যে। এ নিয়ে সোহাগ মায়ের সাথে এর পর গিনির সাথে আলোচনা করে। গিনি জানায় সে তো অনার্স পাশ। সে চাকরি করলে ভালো হবে। সোহাগ তো এস এস সি পাশ। তাতে তো ভালো মানের চাকরী পাবে না। সোহাগ জানায় ঢাকায় গিয়ে চাকরী করবে। কিন্তু গিনি রাজি হয় না। শেষে সিদ্ধান্ত হয় একটা অটোরিক্সা কিনে সেটা চালাবে। গিনির বড়ভাইও জানায় তিনিও রিক্সা কেনায় আর্থিক সহায়তা করবে।
দু’দিন পরই একটি সেকেন্ড হ্যান্ড অটোরিক্সা কিনে আনে সোহাগ। তারপর সেটা নিয়ে সে বেশ যত্ন সহকারে চালায়। মোটামুটি ভালোই বলে সবাই। কম বেশি যাত্রী সে পায় রাস্তায় বের হলে। রোজ ৭০০/৮০০ তো ইনকাম থাকেই, মাঝে মাঝে হাজারও পার হয়ে যায়। গিনিও বেশ খুশি। সে রোজ সোহাগের কাছে ২০০/৩০০ টাকা নিয়ে জমিয়ে রাখে। এভাবে কয়েক দিনে বেশ কিছু টাকা জমে যায় গিনির হাতে। সে নিজের বিকাশে জমানো টাকার সাথে সোহাগের সংসারে জমানো টাকা দিয়ে গরু কিনে আনে। সোহাগদের আগে থেকেই গরুর ঘর করা ছিলো। সোহাগের মা গরু পুষতে চেয়েছিলেন কিন্তু টাকার অভাবে ঘর ঠিকই করেছিলেন কিন্তু গরু কিনতে পারেননি। তাই গিনির এ কাজে তিনি খুব খুশি হন। গরুকে তিনিই দেখাশোনা করেন বেশি। সোহাগকে ঘাস এনে দিতে বলায় তার সময় নেই বলে অটো নিয়ে বেরিয়ে যায়। তখন সোহাগের মা কাচি ও খাচি নিয়ে ক্ষেতে চলে যায়। ঘাস এনে পানি দিয়ে ধুয়ে গরুকে খাওয়ায়। গিনি খুব খুশি হয়।
আজ এলাকায় তেমন একটা যাত্রী সে পায় না। তাই শহরের দিকে যায়। বাস স্ট্যান্ডের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর একটি বাস এসে থামে। সেখানে একটি লোক বড় বড় দুটো ব্যাগ নিয়ে ওঠে সোহাগের রিক্সায়। যে জায়গার নাম বলে সেখানে যায়। লোকটি নেমে ভাড়া মিটিয়ে একটি ব্যাগ নিয়ে চলে যায়। সোহাগও রিক্সা ঘুরিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। ডানে বামে যাত্রীর আশায় তাকায়। কিছুদূর আসার পর এক মহিলা তাকে ডাক দেয়। সে থামে। মহিলা জায়গার নাম বলেই উঠতে গিয়ে সোহাগকে বললো, এটা কার ব্যাগ? সোহাগ শুরুতে বুঝতে পারে না ব্যাগের ব্যাপারটা পরে তার মনে পড়ে বাসস্ট্যন্ডের যাত্রীর কথা। কিন্তু সে মহিলাকে বলে এটা তার নিজেরই ব্যাগ। তারপর ব্যাগটি এক সাইড করে রেখে মহিলাকে বসতে বলে। মহিলা জানতে চায় এর ভেতরে কী আছে? সোহাগ জানায় কিছু কাপড় চোপর। একসময় মহিলা নেমে যায়। সোহাগ আর ভাড়া মারার আশা করে বাড়ির পথ ধরে।পথে এক জায়গায় থেমে ব্যাগের চেইন খুলে দেখে কী আছে ভেতরে। শুরুতে কিছু কাগজ ও কাপড় থাকলেও এক কোনায় পলিথিনে মোড়ানো একটা প্যাকেট পায় সে। সেটা খুলে দেখে অনেকগুলো টাকা। সে টাকাগুলো আবার পলিথিনে মুড়িয়ে সিটের নীচে রেখে দেয়। ব্যাগটি কিছুদূর গিয়ে রাস্তার পাশে জঙ্গলে ফেলে দেয়।
তারপর বাসায় ফিরে আসে। সেদিন আর সে রিক্সা নিয়ে বের হয় না। সন্ধ্যার পর সেই ব্যাগের মালিক অন্য এক রিক্সাওয়ালাকে নিয়ে সোহাগের বাড়িতে হাজির।লোকটি সোহাগকে পেয়ে খুব খুশি হন। তিনি বলেন অনেক কষ্ট করেছি আপনাকে খুঁজে পেতে। আমার ব্যাগ টা দিন। সোহাগ বলে, আমি তো কোনো ব্যাগ পাইনি। লোকটি বলে, আমি তো দুটো ব্যাগ নিয়ে উঠেছিলাম একটি নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। সোহাগ বলে, আপনি কোন ব্যাগ রেখে যাননি। লোকটি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। বলে ভাই টাকা পয়সা তেমন কিছু ছিল না কিন্তু জরুরী কিছু কাগজপত্র ছিল। সেগুলো আমার ভীষণ প্রয়োজন। তবুও সোহাগ বলে আপনার ব্যাগ পাইনি। লোকটি অনুনয়-বিনয় করে বললেও সোহাগ না-ই বলে। অন্য রিক্সাওয়ালাও লোকটিকে বোঝায় এই ছেলেটি ভালো ছেলে। ও পেলে নিশ্চয়ই দিয়ে দিতো। লোকটি কাঁদতে কাঁদতে যে রিক্সা এসেছিল সে রিক্সায় আবার ফিরে চলে যায়। ঘর থেকে গিনি দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল। ওরা চলে গেলে সোহাগের কাছে জানতে চায় -আসলে সে ব্যাগ পেয়েছে কিনা। কিন্তু সোহাগ জবাব দেয়, না।
তারপরদিনও সোহাগ ঘর হতে বের হয় না। গিনি বারবার তাকে বললেও সে বের হয় না। যিনি জানতে চায় তার হয়েছেটা কি? কিন্তু সোহাগ ধীরে ধীরে কেমন যেন বদলে যেতে থাকে। গিনির সাথে খারাপ ব্যবহার করে। বলে দিনশেষে তোমার টাকা পেলেই হলো।বিকেলের দিকে পাশের দোকানে চা খেতে যায় সে। সন্ধ্যার পর ফিরে এসে গিনের হাতে ৫০০ টাকা দেয়। গিনি অবাক হয় এই প্রথম ৫০০ টাকার নোট পেয়ে।সে আর স্বামীকে তেমন কিছু বলে না। রাতে গিনি ঘুমিয়ে পড়লেও সোহাগ ঘুমায় না। সারারাত জেগে থাকে। আর কি যেন চিন্তা করে।
পরদিন বেশ দেরি করে এসে রিক্সা নিয়ে বের হয়। কিন্তু যেই বলে যাবে নাকি সে বলে, যাবো না। কেন যাবে না বললে বলে সমস্যা আছে। বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে সে বাসায় চলে আসে। বিকেল থেকে আর বের হয় না বাসা থেকে। গিনি জানতে চাই কী হয়েছে? সোহাগ উত্তর দেয় তুমি টাকা পেলেই হল তোমার অত সব জানার দরকার কি।
তারপর দিন সোহাগ নতুন প্যান্ট শার্ট পরে রিকশা নিয়ে বের হয়। যাত্রী বললেও সে তোলে না। অন্য রিক্সাওয়ালা যে ব্যাগওয়ালাকে নিয়ে এসেছিল সোহাগের বান ড়িতে তার সাথে দেখা হয়। সে বলে ঘটনা কি, তোমার এত উন্নতি। সোহাগ চলে যায়। লোকটি সোহাগের দিকে তাকিয়ে থাকে। মোবাইল ফোন বের করে কার সাথে যেন কথা বলে। সোহাগ যদি কে গেছে সেদিকে সেও রিক্সা নিয়ে এগিয়ে যায়।
কদিন আগে গিনি গর্ভবতী হয়। হঠাৎ তার অসুস্থতা বেড়ে যায়। ডাক্তার ঔষধেও কাজ হয় না। সোহাগ ও কেমন যেন ব্যবহার করতে থাকে। রিকশা চালায় না ঠিকমত কিন্তু টাকা পয়সা আছে। বাজার থেকে বড় মাছ কিংবা মাংস কিনে নিয়ে আসে। পুরনো রিক্সাটি বিক্রি করে দেয় নতুন রিক্সা কেনে। আবারো সেই রিক্সাওয়ালার সাথে দেখা হয়। রিক্সাওয়ালা সন্দেহ পোষণ করে, টাকার ব্যাগটার ব্যাপারে জানতে চায়। সোহাগ বলে কীসের টাকা – বলেই চলে যায়। রিক্সাওয়ালা টি পকেট থেকে মোবাইল বের করে কার সঙ্গে যেন কথা বলে সোহাগের মায়ের খুব অসুখ হয়। দিন দিন তার অবস্থা খারাপ হতে থাকে। সোহাগ ভেঙে পড়ে। মা স্ত্রী সবাই অসুস্থ। ছোটবোনটাও অসুস্থ হয়ে পড়ে। সোহাগ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে। সে বুঝে উঠতে পারে না কি করবে সে। কেন তার এত বিপদ? সে নিজেকপ্রশ্ন করে। তার বিবেক তাকে বলে লোভের কথা। সে আত্মসমর্পণ করে নিজের কাছে, বিবেকের কাছে। সেই রিকসাওয়ালাকে খুঁজে বের করে। তাকে সত্য ঘটনা খুলে বলে। রিক্সাওয়ালা থাকে ভৎসনা করে। তাকে বলে তুমি এত ভালো ছেলে হয়েও কাজটা তুমি করতে পারলে। এটা তোমার কাছে আশা করিনি। সোহাগ রিক্সাওয়ালার কাছে ক্ষমা চায়। রিক্সাওয়ালা বলে যার। টাকা তাকে ফেরত দিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাও। সোহাগ বলে তাকে আমি পাব কেমন করে। রিক্সাওয়ালা বলে, ওনার মোবাইল নাম্বার আছে আমার কাছে।এই নাও নাম্বার।
সোহাগ মোবাইল নম্বরটি নিজ ফোনে তুলে নেয়। রিক্সাওয়ালা কে বলে আমি তো কিছু টাকা খরচ করে ফেলেছি। রিক্সাওয়ালা বলে অসুবিধা নেই বাকিগুলো ফেরত দিয়ে দাও।
সোহাগ মোবাইলে কল দেয়….
(সমাপ্ত )
সংগ্রহ : লেখকের সৌজন্যে